রোবার্ড

| |






ধ্রুব নীল

রাগে দুঃখে পায়েলের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। তবে নিজের নয়, বোতল মামার। এমনিতেই মেজাজ তিরিক্ষী হয়ে আছে। তারমধ্যে একগাদা যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটখাট দেখতে আর কতো ভাল লাগে! ঠিকমতো কথাও বলছে না বোতল মামা। একটা প্লাস্টিকের টুকরোর মধ্যে হিজিবিজি যন্ত্র লাগাতেই ব্যস্ত। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বোতল মামার চুল চেপে ধরতে পারছে না পায়েল।
স্কুল থেকে ফেরার পথেই মেজাজটা খারাপ হয়। সব দোষ ওই বদের হাড্ডি অপুটার। পায়েলের সঙ্গেই পড়ে। হাতের টিপ ভাল। এক ঢিলেই আম পাড়তে ওস্তাদ। কিন্তু তাই বলে পাখি! ফেরার পথে গাছের ডালে একটা টিয়া দেখে লোভী দৃষ্টিতে তাকায় অপু। পায়েল বুঝতে পারে, কী ঘটতে যাচ্ছে। ঢিল ছুড়ে টিয়াকে আহত করতে চায় বদ ছেলেটা। পায়েল বাধা দেয়ার আগেই টিয়া পাখিটা সোজা মাটিতে আছড়ে পড়ে। নির্দয়ের মতো পাখিটাকে চেপে ধরে পায়েলের দিকে একগাল হেসে অপু বলে, হে হে দেখলিতো! এক খাঁচায় এবার দশটা পাখি রাখবো। পায়েল রাগে ফুঁসে উঠলেও কোনো জবাব দিতে পারে না। বাসায় ফিরেই দেখে বোতল মামা হাজির। সঙ্গে যথারীতি একগাদা খুঁটিনাটি যন্ত্রভর্তি বেঢপ সাইজের একটা ব্যাগ। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পায়েলের মন খারাপের কারণ জানা হয় বোতল মামার। তারপরই বসে একমনে খুটখাট কাজ শুরু। কোনো দিকে খেয়ালই নেই।
মামা! তুমি কি থামবে! বোতল মামা উঁ জাতীয় শব্দ করলেন।
মামা, কী করছো তা কি আমাকে বলা যায়? বোতল মামা মাথা তুললেন। পায়েলের দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন। বললেন, তোর মেজাজ খারাপের ওষুধ বানাচ্ছি।
কিন্তু আমি ঐ বিচ্ছিরি প্লাস্টিকের খেলনা নেব না! বোতল মামা মুচকি হাসলেন, ধুর বোকা! এটা তোর খেলার জন্য বানাচ্ছি না। এটা বানাচ্ছি...। দাঁড়া আগে বানাই, তারপর দেখবি।
কতোক্ষণ লাগবে শুনি? বোতল মামা জবাব দিলেন না। তারমানে কয়েক ঘণ্টা কিংবা তারচেয়েও বেশি।
রাতের খাওয়া শেষ করে আবার সেই যন্ত্রপাতি নিয়ে বসেছেন মামা। পায়েল হাল ছেড়ে দিয়েছে। মামার সঙ্গে আর চুটিয়ে গল্প করা হচ্ছে না। অগত্যা মামার বানানো সেই অদ্ভুত টেলিস্কোপ নিয়ে সোজা ছাদে গেল। আজ সে প্লুটো দেখবে বলে ঠিক করেছে। অবশ্য প্লুটো এখন আর গ্রহ নেই। ইউরোপ-আমেরিকার বিজ্ঞানীরা প্লুটোকে গ্রহ মানতে নারাজ। তা নিয়ে পায়েলের মাথাব্যথাও নেই। বোতল মামা বলেছে, প্লুটোকে যে নামেই ডাকুক, সে তার আগের কক্ষপথেই ঘুরবে।
প্লুটোর দিকে তাকাতেই আবার মেজাজ খারাপ হয় পায়েলের। এতো একটা বরফের চাঁই! না আছে পাহাড়, না আছে বড় বড় গর্ত। টেলিস্কোপটা গুটিয়ে গটগট করে ছাদ থেকে নেমে যায় পায়েল।
পায়েল! এদিকে আয়! বোতল মামার ডাক শুনে থমকে দাঁড়ালো পায়েল। তোর মাকে বল চা দিতে, আর তুই আমাকে একটা পাখির ছবি এঁকে দে।
পাখির ছবি! মামার হঠাৎ পাখির ছবির কী দরকার পড়লো? রাগের চেয়ে কৌতুহল বেড়ে যাচ্ছে পায়েলের। চোখ কুঁচকে ড্রইং খাতা আর পেন্সিল খুঁজতে লাগলো। এক ফাঁকে রান্নাঘরেও উঁকি দিলো। মাকে কিছু বলতে হবে না। চুলায় পানি ফুটছে।
মামা, ছবি দিয়ে কী হবে?
একটা মাঝারি সাইজের পাখির ছবি আঁক।
মামার হাতের দিকে তাকালো পায়েল। প্লাস্টিকের টুকরোটার উপর ছোটখাট অনেককিছু জুড়ে দেয়া হয়েছে। ছোট ছোট চাকতি, পাখা আর চিকন লোহার শিক দেখতে পাচ্ছে পায়েল।
তাড়াতাড়ি কর। বোতল মামার চোখে চাপা উত্তেজনা। পায়েলও কিছু জিজ্ঞেস না করে পাখির ছবি আঁকতে লাগলো। ছবিতে রং করার আগেই বোতল মামা বললেন, হয়েছে, এতেই হবে।
চোখে একগাদা প্রশ্ন নিয়ে মামার কাজ দেখছে পায়েল। প্লাস্টিকের টুকরোটাকে আলতো করে ভাঁজ করছেন বোতল মামা। একটু পরেই আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারলো পায়েল। মুহূর্তে তার রাগ-টাগ সব পানি হয়ে গেল। মামা তাহলে একটা পাখি বানাচ্ছে! রোবট পাখি!
এক ঘণ্টা পর। চা শেষ করে চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছেন বোতল মামা। তার সামনে টেবিলের উপর একটা প্লাস্টিকের তৈরি পাখি। পায়েল মুগ্ধ দৃষ্টিতে পাখিটার দিকে তাকিয়ে আছে। এর মধ্যে পাখির গায়ে ও ডানায় আঠা দিয়ে কাগজের পালক জুড়ে দেয়া হয়েছে। সেই পালকে রং করেছে পায়েল। মাপমতো বসেছে ডানা দুটো। শুধু ঠোঁটটা দেখতে একটু অন্যরকম হয়েছে।
বুঝলি! একেবারে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলবো। এখন শুধু পাখিটার ভেতর কয়েকটা সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দিতে হবে।
কী সফটওয়্যার মামা? বোতল মামা চোখ বুঁজলেন। বড় করে দম নিয়ে বললেন, ওড়ার জন্য যা যা দরকার সবই আছে। ডানা দুটো সেকেন্ডে দশবার ওঠানামা করতে পারবে। বাকি শরীরের ওজন খুব কম। উড়তে কোনো সমস্যাই হবে না। নাকে লাগিয়েছি মিনি রাডার। নিজে নিজেই মানচিত্র তৈরি করতে পারবে। চোখে আছে ভিডিও ক্যামেরা আর কানে হিয়ারিং ডিভাইস। সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দিলে নিজেকেই নিজে কন্ট্রোল করতে পারবে।
কিন্তু পাখি উড়বে কী করে? রিমোট কন্ট্রোলার কোথায়? বোতল মামা চোখ খুললেন। চেয়ার ছেড়ে পায়চারি করতে লাগলেন। বললেন, জ্যান্ত হোক আর রোবট হোক, পাখি মাত্রই স্বাধীন। তাই রিমোট কন্ট্রোলার বানাইনি। নিজে নিজেই উড়বে। দিকও পাল্টাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। আর.. আর.. আরো একটা কাজ করতে পারবে।’
পায়েল বুঝে গেল, আর যে কাজটা বাকি আছে সেটাই আসল কাজ। তার জন্যই রোবট পাখিটা বানিয়েছে বোতল মামা। পায়েল প্রশ্ন করার আগেই বোতল মামা বললেন, ঠোঁটের দিকে তাকা, অন্যরকম লাগছে? এটা আমার তৈরি বিশেষ একটা ধাতু দিয়ে তৈরি। একটা পাশ অসম্ভব ধারালো। লোহা পর্যন্ত কেটে ফেলতে পারবে। ভয় পাস্নে, মানুষকে ভুলেও ঠোকর দেবে না।’
যাই হোক না কেন, পাখি উড়লেই পায়েল খুশি। পায়েলের ইচ্ছেটা বুঝতে দেরি হলো না বোতল মামার। মুখে কিছুটা সিরিয়াস ভাব ফুটিয়ে বললেন, এখন ঘুমা, সকালে মজা দেখবি।’
পায়েল উঠে চলে গেলো। বিছানায় শুয়েও পড়লো। কিন্তু ঘুম আসা কি অতো সহজ! মনে মনে রোবট পাখিটার একটা নাম ঠিক করলো। রোবটের রো আর পাখির ইংরেজি বার্ড নিয়ে নাম দিলো রোবার্ড। শুনতে মন্দ নয়।
সকাল ৭টা বেজে ১০ মিনিট। ছাদে একটা চাদর জড়িয়ে বসে আছেন বোতল মামা। তাকে উস্কোখুস্কো চুলের সন্যাসীর মতো দেখাচ্ছে। পায়েলের চোখ ফোলা। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। অবশ্য বোতল মামার সঙ্গে চায়ে চুমুক দিতেই আলসেমী কেটে গেছে।
‘শোন, পাখির সুইচ অন করলেই খেলা শুরু। তারপর আর ফেরানো যাবে না।’
‘মামা! পাখি বলবে না, ওটার নাম রোবার্ড।’
‘বেশ ঠিকাছে, রোবার্ড কিন্তু আমাদের কাছে থাকবে না।’
‘বুঝেছি বুঝেছি! সুইচ টিপলেই ফুরুৎ। কিন্তু অন করবে তো!
‘দাঁড়া আরেকটু চার্জ হোক। রোবার্ডের ভেতর কিন্তু ব্যাটারি নেই। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করেই উড়বে। দুই ঘণ্টার চার্জে চব্বিশ ঘণ্টা উড়বে।’
‘হুঁম, নো প্রবলেম। আজ শুক্রবার। আমার কোনো তাড়া নেই।’
ছাদে একটা শালিক বসেছে। ঘাড় উঁচিয়ে রোবার্ডের দিকে কয়েকবার তাকালেও কাছে আসার সাহস পায়নি। পায়েল ভাবতে লাগলো, পাখিরা আছে মহা আরামে। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। ফুরফুর করে উড়ে বেড়াও। কিন্তু মানুষ যে কেন পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখে তা মাথায় ঢোকে না। পাখি আটকে রাখলে কি গুপ্তধন পাওয়া যায়? অথচ শুধু বাংলাদেশেই লাখ লাখ পাখি এখন খাঁচাবন্দি। পুরো পৃথিবীতে না জানি কতো পাখি বন্দি দিন কাটাচ্ছে!
‘রোবার্ড ইজ রেডি।’ বোতল মামার কথায় সম্বিত ফিরে পায় পায়েল। বোতল মামা দুহাতের তালু ঘষলেন। আলতো করে তুলে নিলেন রোবার্ডকে। পেটের কাছে লাল একটা বোতামে চাপ দিতেই মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ। পায়েল অনেক কষ্টে চোখের পলক আটকে রেখেছে। যদি কিছু মিস্ করে!
রোবার্ডের চোখের ফুটোয় দুটো বাতি জ্বলতে দেখা গেলো। তারমানে রোবার্ড দেখছে! ডানা দুটো তিরতির করে কাঁপতে শুরু করলো!
‘মামা! ছেড়ে দাও! যদি কামড় দেয়!
বোতল মামা ছাড়ার আগেই খটাস্ খটাস্ শব্দ। ঠং ঠং ঠরররং। যান্ত্রিক ডানা দুটো সজোরে উঠছে আর নামছে। সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় দশ মিটার উঠে গেলো রোবট পাখিটা।
‘রোবার্ড উড়ছে! মামা রোবার্ড উড়ছে!
পত্ পত্ নয়, অনেকটা খট্ খট্ শব্দ করে বোতল মামা আর পায়েলের মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে রোবার্ড। বোতল মামা ফিসফিস করে বললেন, এবার পাখি দিয়ে পাখি তোলা হবে।’
মামার কথায় কান নেই পায়েলের। অদ্ভুত দৃষ্টিতে রোবার্ডের কাণ্ড দেখছে।
পায়েলদের দুটো বাসা পরেই অপুদের বাসা। রোবার্ডটা সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে। অপুদের বাড়িটাকে ঘিরে উড়ছে আর প্লাস্টিকের ঘাড়টাকে দ্রুত এদিক সেদিক নাড়াচ্ছে।
হঠাৎ অপুদের বারান্দার রেলিংয়ে বসলো রোবার্ড। পায়েলের চোখ কপালে ওঠার দশা। করছে কি পাখিটা! অপু যদি রোবার্ডকে ধরে ফেলে! কিন্তু না! রোবার্ডকে দেখে মনে হচ্ছে সে যথেষ্ঠ সাবধান। অনেকটা চোরের মতো গ্রিলের ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকলো।
‘মামা রোবার্ড কী করবে!
‘দেখ কী করে। সিস্টেম মতোই কাজ করছে।’
অপু যে খাঁচাটায় পাখি আটকে রাখে সেটার একটা অংশ দেখতে পাচ্ছে পায়েল। রোবার্ডটা সেই খাঁচার উপরেই দাঁড়িয়ে। পায়েলের ভয় লাগছে না। বিশেষ কিছু ঘটার অপেক্ষায় আছে সে।
রোবার্ড তার বিশেষভাবে তৈরি ধারালো ঠোঁট দিয়ে খাঁচার একটা শিক কামড়ে ধরলো। ঘাড় বাঁকাতেই কুটুস করে কেটে গেলো শিক। মনে হলো যেন আলতো করে বাদাম ছিঁড়ছে পাখিটা। একটি, দুটি, তিনটি! পাখি বেরিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট ফাঁক তৈরি হয়েছে। ব্যাস্, রোবার্ডের ইশারা দেখে খাঁচা বন্দি পাখিগুলো এক ঝটকায় বাইরে। একে একে সবাই ফুরুৎ। বেচারা অপু দৌড়ে বারান্দায় এসে আকাশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
এদিকে পায়েলের খুশি দেখে কে! তার চিৎকারে বোতল মামাও খানিকটা বিব্রত। যদি ধরা খেয়ে যান! পায়েল বলেই যাচ্ছে, গো! রোবার্ড গো!
অন্যদিকে খাঁচাবন্দি পাখিগুলো এদিক সেদিক উড়ে গেলেও রোবার্ড ছুটছে আরেকটা বাসা লক্ষ্য করে। তার চোখের ক্যামেরায় আরেকটা খাঁচাবন্দি পাখি ধরা পড়েছে!
এক সপ্তাহ পরের এক বিকেল। বোতল মামা আর পায়েল ছাদে। পায়েলের হাতে একটা পত্রিকা। সে জোরে জোরে একটা খবর পড়ছে। খবরটা অনেকটা এরকম।
‘দেশের বেশকটি জেলায় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। খাঁচা ফুটো করে পোষা পাখি ছেড়ে দিচ্ছে এক রহস্যময় চোর। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চোর নিজেই একটা পাখি। এ নিয়ে পাখি ব্যবসায়ীরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কেননা, এরই মধ্যে দুজন ব্যবসায়ীর প্রায় ত্রিশটি খাঁচা ফুটো করে দুইশ পাখি ছেড়ে দিয়েছে সেই চোর।’
এটুকু পড়েই পায়েল ইয়াহু বলে চিৎকার করে উঠলো। বোতল মামা উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি ভাবছেন অন্য জিনিস। পৃথিবী কেন, বাংলাদেশেরই সবগুলো বন্দি পাখিকে মুক্ত করার ক্ষমতা রোবার্ডের নেই। ঝড়-বৃষ্টিতে ভেতরের একটা যন্ত্র নষ্ট হলেই রোবার্ড অকেজো হয়ে যাবে। তার পক্ষে একগাদা রোবার্ড তৈরিও সম্ভব নয়। আপাতত এ তথ্য গোপন রাখবেন বলে ঠিক করেছেন বোতল মামা। যাই হোক, কয়েকশ পাখিতো মুক্ত হচ্ছে! এটাই বা কম কী! এদিকে পায়েল চিৎকার করেই যাচ্ছে, গো! রোবার্ড গো!

No comments:

Post a Comment