ঢাকায় বোতল মামা

| | 0 comments




ধ্রুব নীল

‘স্যার ডাইনে চাপেন, বামে মুড়ির টিন।’
কথাটা বলেছে রোবট মন্টু। সে এখন বাসের হেলপারদের ভাষাও রপ্ত করেছে। মুড়ির টিন মানে লোকাল বাস। আর স্যার হলেন বোতল মামা। তিনি বিশেষ কাজে গতকাল ঢাকায় এসেছেন। সঙ্গে যথারীতি পায়েল। তবে সে কোনো কাজে আসেনি। মামার সদ্য আবি®কৃত বিশেষ গাড়িতে চড়াই তার আসল উদ্দেশ্য। সঙ্গে খালার বাসায় বেড়ানোটাও হয়ে যাবে। এক ঢিলে দুই আম।
‘মামা এ জ্যাম কি আজকের মধ্যে শেষ হবে? যাকে প্রশ্নটা করা হয়েছে তিনি আছেন গভীর চিন্তায়। চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবছেন। হুঁম, জ্যাম নয়, একে বলে সিগনাল, বাতি জ্বললে এমনি এমনিই চলবে।’ ভ্রƒ কুঁচকে গেল পায়েলের। এমনি এমনি চলবে মানে! গাড়ি তুমি চালাচ্ছ না? বোতল মামা উদাস কণ্ঠে জবাব দিলেন, নারে, এই ড্রাইভিং জিনিসটা এখনো শেখা হয়নি, গাড়িটা অটোমেটিক চলছে।’ 
পায়েল মহাবিস্মিত। তাহলে স্টিয়ারিং ধরে রেখেছ কেন? বোতল মামা কিছু বললেন না। তিনি আসলে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালানোর অভিনয় করছেন। গাড়ি নিজে নিজে চলছে দেখলে লোকের ভিড় জমে যেতে পারে।
বোতল মামার সদ্য আবি®কৃত গাড়িটা দেখতে মাঝারি সাইজের জিপের মতো। তবে হুড খোলা নয়। বেশ বড়সড় ছাদ আছে। ওটার কারণেই মানুষজন বারবার আড়চোখে গাড়িটা দেখছে। অবশ্য ভেতরের কোনো পার্টসই নতুন নয়। জোড়াতালি দিয়ে তৈরি। দেয়ালজুড়ে একগাদা সার্কিট বোর্ড বসানো। ছাদের দিকটায় বড় সড় একটা ফাঁপা অংশ আছে। সেখানে একটা কিছু থাকলেও আপাতত তা কেউ দেখছে না।
‘মামা গাড়িটা সব বুঝতে পারছে কী করে? একটু সময় নিয়ে প্রশ্নটা করলো পায়েল। এই কাঠফাটা গরমে একগাদা প্রশ্ন করে মামার মাথা গরম করে দেবে না বলে ঠিক করেছে।
‘মোশন সেন্সর আছে গোটা দশেক। নড়াচড়া দেখেই বুঝতে পারবে সামনে কী হচ্ছে, লাল-সবুজ বাতিও দেখতে পাবে।’
‘আমরা যাচ্ছি কোথায়? বোতল মামার কোলের উপর একটা ল্যাপটপ কম্পিউটারের মতো বস্তু, ওটার মধ্যে একটা মানচিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি সেখানে কী যেন খুঁজছেন।
‘আমরা যাবো মিরপুর। দশ নাম্বার গোলচক্করে আমার এক বন্ধু অপেক্ষা করছে।’ বোতল মামা একটা বোকা টাইপের হাসি দিয়ে পায়েলের দিকে তাকালেন। বুঝলি, আমার বন্ধু মানে, জাপান থেকে এসেছে। আমার গবেষণায় অনেক সাহায্য করেছে, ইয়ে মানে, তাকে একটা জিনিস পৌঁছে দিতে হবে। নতুন একটা যন্ত্রের নকশা। ও সেটা বানিয়ে পরে আমাকে দেবে।’
পায়েল হা করে তাকিয়ে শুনছে। বোতল মামার বন্ধু! তাও আবার জাপানি বিজ্ঞানী! মামা! তুমি কী এমন বানিয়েছ, যা নিতে জাপান থেকে তোমার বন্ধু চলে এলো! বোতল মামা কিছু বলার আগেই অদ্ভুত জিপ গাড়িটা চলতে শুরু করলো। মামাও তড়িঘড়ি করে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে এদিক ওদিক ঘোরাতে লাগলেন। দেখে মনে হচ্ছে তার সমস্ত মনযোগ এখন গাড়ি চালানোর দিকে। বোতল মামার মাত্রাতিরিক্ত অভিনয়ের কারণেই হোক আর গাড়িটার অদ্ভুত দর্শনের জন্যই হোক, পল্টন পার হতে না হতেই ট্রাফিক সার্জেন্টের চোখে পড়ে যায় বিশেষ জিপ গাড়িটা।
‘এই সেরেছে!
‘কী হলো মামা!
পেছনের সিটে বসে থাকা মন্টু উঁকি দিয়ে বলল, স্যার, থামায়েন না, বরাবর টানেন।’ এমনিতেই ঘেমে চুপসে গেছেন বোতল মামা। কোঁকড়া চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। নাহ্, মন্টুর কথা শুনতে গেলে বিপদ আরো বাড়বে। বোতল মামা পায়েলের দিকে না তাকিয়েই ফিসফিস করে বললেন, বুঝলি, গাড়িতো আর আমি চালাচ্ছি না, তাই ড্রাইভিং লাইসেন্স করা হয়নি। কাগজপত্র কিছু আছে, তাতে লাভ হবে না। ভেতরে এতো যন্ত্রপাতি দেখলে জঙ্গি সন্দেহে সোজা জেলে।’ পায়েলের পিঠের দিকে শিরশির করে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। এখন উপায়!
‘দেখি কাগজ দেখি।’
বোতল মামা লাজুক টাইপের হাসি দিলেন। চৈত্র্যের আগুন গরমে এমন হাসি দেয়া মামার মোটেও উচিৎ হয়নি। সন্দেহের চাপে সার্জেন্টের ভ্রƒ আরেকটু উপরে উঠে গেল। বোতল মামা প্যান্টের পকেটে কী যেন হাতড়াতে লাগলেন। কিন্তু সেই পুরনো সমস্যা। শার্ট আর প্যান্টে এতোগুলো পকেট, কোথায় কি থাকে মনে রাখাই মুশকিল। বোতল মামা একে একে পকেট হাতড়াচ্ছেন আর সার্জেন্টের চেহারায় বিরক্তির ছাপ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
‘দেখি বুঝছি, নামুন।’
যাক সময়মতো জিনিসটা পেয়ে গেলেন মামা। ছোট একটা আইডি কার্ড। বিশেষ মুহূর্তে এটা বেশ কাজে আসে। তবে এখন নাও আসতে পারে। জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে কার্ডটা সার্জেন্টের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।
‘উঁহু, এটা নয়, লাইসেন্স দেখতে চেয়েছি।’
‘জ্বি এটা... এটা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সংস্থার পরিচয় পত্র। আমি একজন বিজ্ঞানী।’
সার্জেন্ট হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। পায়েল বুঝতে পারলো অবস্থা বেগতিক।
‘আগে নামেন, তারপর আইনস্টাইন নিউটন সব বের হবে।’
পায়েল কিছুটা অপমাণ বোধ করলেও বোতল মামা চোখ কুঁচকে কী যেন ভাবছেন। এখন মনে হচ্ছে মন্টুর কথাই শোনা উচিৎ ছিল।
সার্জেন্টের হাত থেকে আইডি কার্ডটা নিয়ে পকেটে ঢোকালেন বোতল মামা। ভাব দেখে মনে হবে তিনি বুঝি নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আসলে ভাবছেন অন্য কিছু। গাড়ির নাম্বার প্লেটটা পুরনো এবং যথারীতি তা আসল নয়। পালিয়ে গেলে খুব একটা অপরাধ হবে না। তার এ বিশেষ গাড়ির জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স তো না থাকলেও চলে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট ওয়্যারলেসে কী যেন নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। তার খুব একটা তাড়া আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে মামাকেও খুব একটা চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছে না। আপাতত পালাবেন বলে ঠিক করেছেন। তবে সমস্যা একটা রয়েই গেছে। গাড়িকে নির্দেশ দিয়েও লাভ নেই। সামনে কিছু থাকলে গাড়িটা শত নির্দেশেও চলবে না। আর তাদের জিপটার ঠিক সামনেই রাখা আছে সার্জেন্টের মোটর সাইকেল। অগত্যা দ্বিতীয় পথে না গেলে আর হচ্ছে না। বোতল মামা দ্রুত ইশারায় পায়েলকে বুঝিয়ে দিলেন, শক্ত করে ধরে বস।’ উত্তেজনায় পায়েল ঘাড় নাড়াতেও ভুলে গেছে। সিটের হাতল আঁকড়ে ধরতেই বোতল মামা সামনের একটা সুইচে টিপে দিলেন। সার্জেন্টের অবাক দৃষ্টি উপেক্ষা করে দুই জন মানুষ ও একটা রোবট শুদ্ধ আস্ত জিপখানা শূন্যে উঠতে শুরু করলো। গাড়ির নিচে তীব্র বেগে একটা কিছু বেরুচ্ছে। পায়েলের বুঝতে দেরি হয়নি গাড়িটার নিচে রকেটের মতো জেট ইঞ্জিন আছে। ট্রাফিক সার্জেন্ট হতভম্ব হয়ে নিউটনের তৃতীয় সূত্র চাক্ষুষ করছেন। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে বিশাল জটলা পাকিয়ে গেল। সিনেমা ছাড়া এমন দৃশ্য কেউ এর আগে দেখেনি।
এদিকে গাড়িটা বিশ ফুটের মতো উঠে থেমে গেছে। আর উঠতে পারছে না। কিন্তু সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুইচ কোনটা তা মনে পড়ছে না মহাবিজ্ঞানী বোতল মামার। তাকে বেশ অসহায় দেখাচ্ছে। নিচে ততোক্ষণে মহা হই চই। পুলিশের বাঁশিতে কান পাতা দায়। পায়েল হাতল ছেড়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। ক্লিক ক্লিক শব্দ আর আলোর ঝলকানি দেখতে পাচ্ছে। তার মানে পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় বোতল মামা! একটু আগে ভয়ে আধখানা হলেও এখন পায়েল খুশিতে আটখানা। রাস্তায় বিশাল জ্যাম লেগে গেছে। তা নিয়ে পায়েলের চিন্তা নেই। তারা এখন সকল জ্যামের উর্ধ্বে। সিগনালেও কিছু যায় আসে না।
‘কিন্তু মামা গাড়িটা সামনে এগুচ্ছে না কেন? বোতল মামা জবাব না দিয়ে একের পর এক সুইচ টিপতে লাগলেন। একটু পর গাড়ির ছাদ ফুটো হয়ে পতপত করে একটা প্যারাসুট খুলে গেলো। ওটার জন্যই ছাদটাকে ফাঁপা মনে হচ্ছিল। নাহ্ ভুল হচ্ছে! আপনমনে বিড়বিড় করছেন বোতল মামা। নিচের হই চইয়ে তার নজর নেই।
শেষপর্যন্ত আসল সুইচটা পেয়ে গেলেন। কিন্তু শুধু এটা টিপলেই গাড়ি চলবে না। দিক পাল্টানোর জন্য বোতল মামাকে স্টিয়ারিং ঘোরাতে হবে, আর এক্সিলারেটরটাও চেপে ধরতে হবে। শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স ছাড়াই ড্রাইভিং করতে হচ্ছে। অবশ্য গাড়িটা মাটিতে নেই বলেই রক্ষে। বোতল মামার মুখে তাই বিজয়ীর হাসি। জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে সেই ট্রাফিক সার্জেন্টের দিকে তাকালেন। সার্জেন্টও মামার দিকে তাকিয়ে আছেন। তবে তার ভ্রƒ কুঁচকে নেই। তিনিও অন্য সবার মতো হাত নেড়ে বাহবা দিচ্ছেন। ভাবখানা এমন যেন এমন আবিষ্কারে তিনি মহাগর্বিত।
নিচ থেকে পায়েলকে উদ্দেশ্য করে কে যেন চিৎকার করে উঠলো, খুকী, তোমরা যাবে কোথায়? পায়েল উত্তর দেয়ার আগেই পেছনের জানালা দিয়ে মন্টু মাথা বের করে গাড়ির দেয়াল চাপড়ে বলতে লাগলো, আসেন আসেন সিট খালি সিট খালি শাহবাগ, ফারমগেট...।’


রোবার্ড

| | 0 comments






ধ্রুব নীল

রাগে দুঃখে পায়েলের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। তবে নিজের নয়, বোতল মামার। এমনিতেই মেজাজ তিরিক্ষী হয়ে আছে। তারমধ্যে একগাদা যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটখাট দেখতে আর কতো ভাল লাগে! ঠিকমতো কথাও বলছে না বোতল মামা। একটা প্লাস্টিকের টুকরোর মধ্যে হিজিবিজি যন্ত্র লাগাতেই ব্যস্ত। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বোতল মামার চুল চেপে ধরতে পারছে না পায়েল।
স্কুল থেকে ফেরার পথেই মেজাজটা খারাপ হয়। সব দোষ ওই বদের হাড্ডি অপুটার। পায়েলের সঙ্গেই পড়ে। হাতের টিপ ভাল। এক ঢিলেই আম পাড়তে ওস্তাদ। কিন্তু তাই বলে পাখি! ফেরার পথে গাছের ডালে একটা টিয়া দেখে লোভী দৃষ্টিতে তাকায় অপু। পায়েল বুঝতে পারে, কী ঘটতে যাচ্ছে। ঢিল ছুড়ে টিয়াকে আহত করতে চায় বদ ছেলেটা। পায়েল বাধা দেয়ার আগেই টিয়া পাখিটা সোজা মাটিতে আছড়ে পড়ে। নির্দয়ের মতো পাখিটাকে চেপে ধরে পায়েলের দিকে একগাল হেসে অপু বলে, হে হে দেখলিতো! এক খাঁচায় এবার দশটা পাখি রাখবো। পায়েল রাগে ফুঁসে উঠলেও কোনো জবাব দিতে পারে না। বাসায় ফিরেই দেখে বোতল মামা হাজির। সঙ্গে যথারীতি একগাদা খুঁটিনাটি যন্ত্রভর্তি বেঢপ সাইজের একটা ব্যাগ। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পায়েলের মন খারাপের কারণ জানা হয় বোতল মামার। তারপরই বসে একমনে খুটখাট কাজ শুরু। কোনো দিকে খেয়ালই নেই।
মামা! তুমি কি থামবে! বোতল মামা উঁ জাতীয় শব্দ করলেন।
মামা, কী করছো তা কি আমাকে বলা যায়? বোতল মামা মাথা তুললেন। পায়েলের দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন। বললেন, তোর মেজাজ খারাপের ওষুধ বানাচ্ছি।
কিন্তু আমি ঐ বিচ্ছিরি প্লাস্টিকের খেলনা নেব না! বোতল মামা মুচকি হাসলেন, ধুর বোকা! এটা তোর খেলার জন্য বানাচ্ছি না। এটা বানাচ্ছি...। দাঁড়া আগে বানাই, তারপর দেখবি।
কতোক্ষণ লাগবে শুনি? বোতল মামা জবাব দিলেন না। তারমানে কয়েক ঘণ্টা কিংবা তারচেয়েও বেশি।
রাতের খাওয়া শেষ করে আবার সেই যন্ত্রপাতি নিয়ে বসেছেন মামা। পায়েল হাল ছেড়ে দিয়েছে। মামার সঙ্গে আর চুটিয়ে গল্প করা হচ্ছে না। অগত্যা মামার বানানো সেই অদ্ভুত টেলিস্কোপ নিয়ে সোজা ছাদে গেল। আজ সে প্লুটো দেখবে বলে ঠিক করেছে। অবশ্য প্লুটো এখন আর গ্রহ নেই। ইউরোপ-আমেরিকার বিজ্ঞানীরা প্লুটোকে গ্রহ মানতে নারাজ। তা নিয়ে পায়েলের মাথাব্যথাও নেই। বোতল মামা বলেছে, প্লুটোকে যে নামেই ডাকুক, সে তার আগের কক্ষপথেই ঘুরবে।
প্লুটোর দিকে তাকাতেই আবার মেজাজ খারাপ হয় পায়েলের। এতো একটা বরফের চাঁই! না আছে পাহাড়, না আছে বড় বড় গর্ত। টেলিস্কোপটা গুটিয়ে গটগট করে ছাদ থেকে নেমে যায় পায়েল।
পায়েল! এদিকে আয়! বোতল মামার ডাক শুনে থমকে দাঁড়ালো পায়েল। তোর মাকে বল চা দিতে, আর তুই আমাকে একটা পাখির ছবি এঁকে দে।
পাখির ছবি! মামার হঠাৎ পাখির ছবির কী দরকার পড়লো? রাগের চেয়ে কৌতুহল বেড়ে যাচ্ছে পায়েলের। চোখ কুঁচকে ড্রইং খাতা আর পেন্সিল খুঁজতে লাগলো। এক ফাঁকে রান্নাঘরেও উঁকি দিলো। মাকে কিছু বলতে হবে না। চুলায় পানি ফুটছে।
মামা, ছবি দিয়ে কী হবে?
একটা মাঝারি সাইজের পাখির ছবি আঁক।
মামার হাতের দিকে তাকালো পায়েল। প্লাস্টিকের টুকরোটার উপর ছোটখাট অনেককিছু জুড়ে দেয়া হয়েছে। ছোট ছোট চাকতি, পাখা আর চিকন লোহার শিক দেখতে পাচ্ছে পায়েল।
তাড়াতাড়ি কর। বোতল মামার চোখে চাপা উত্তেজনা। পায়েলও কিছু জিজ্ঞেস না করে পাখির ছবি আঁকতে লাগলো। ছবিতে রং করার আগেই বোতল মামা বললেন, হয়েছে, এতেই হবে।
চোখে একগাদা প্রশ্ন নিয়ে মামার কাজ দেখছে পায়েল। প্লাস্টিকের টুকরোটাকে আলতো করে ভাঁজ করছেন বোতল মামা। একটু পরেই আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারলো পায়েল। মুহূর্তে তার রাগ-টাগ সব পানি হয়ে গেল। মামা তাহলে একটা পাখি বানাচ্ছে! রোবট পাখি!
এক ঘণ্টা পর। চা শেষ করে চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছেন বোতল মামা। তার সামনে টেবিলের উপর একটা প্লাস্টিকের তৈরি পাখি। পায়েল মুগ্ধ দৃষ্টিতে পাখিটার দিকে তাকিয়ে আছে। এর মধ্যে পাখির গায়ে ও ডানায় আঠা দিয়ে কাগজের পালক জুড়ে দেয়া হয়েছে। সেই পালকে রং করেছে পায়েল। মাপমতো বসেছে ডানা দুটো। শুধু ঠোঁটটা দেখতে একটু অন্যরকম হয়েছে।
বুঝলি! একেবারে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলবো। এখন শুধু পাখিটার ভেতর কয়েকটা সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দিতে হবে।
কী সফটওয়্যার মামা? বোতল মামা চোখ বুঁজলেন। বড় করে দম নিয়ে বললেন, ওড়ার জন্য যা যা দরকার সবই আছে। ডানা দুটো সেকেন্ডে দশবার ওঠানামা করতে পারবে। বাকি শরীরের ওজন খুব কম। উড়তে কোনো সমস্যাই হবে না। নাকে লাগিয়েছি মিনি রাডার। নিজে নিজেই মানচিত্র তৈরি করতে পারবে। চোখে আছে ভিডিও ক্যামেরা আর কানে হিয়ারিং ডিভাইস। সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দিলে নিজেকেই নিজে কন্ট্রোল করতে পারবে।
কিন্তু পাখি উড়বে কী করে? রিমোট কন্ট্রোলার কোথায়? বোতল মামা চোখ খুললেন। চেয়ার ছেড়ে পায়চারি করতে লাগলেন। বললেন, জ্যান্ত হোক আর রোবট হোক, পাখি মাত্রই স্বাধীন। তাই রিমোট কন্ট্রোলার বানাইনি। নিজে নিজেই উড়বে। দিকও পাল্টাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। আর.. আর.. আরো একটা কাজ করতে পারবে।’
পায়েল বুঝে গেল, আর যে কাজটা বাকি আছে সেটাই আসল কাজ। তার জন্যই রোবট পাখিটা বানিয়েছে বোতল মামা। পায়েল প্রশ্ন করার আগেই বোতল মামা বললেন, ঠোঁটের দিকে তাকা, অন্যরকম লাগছে? এটা আমার তৈরি বিশেষ একটা ধাতু দিয়ে তৈরি। একটা পাশ অসম্ভব ধারালো। লোহা পর্যন্ত কেটে ফেলতে পারবে। ভয় পাস্নে, মানুষকে ভুলেও ঠোকর দেবে না।’
যাই হোক না কেন, পাখি উড়লেই পায়েল খুশি। পায়েলের ইচ্ছেটা বুঝতে দেরি হলো না বোতল মামার। মুখে কিছুটা সিরিয়াস ভাব ফুটিয়ে বললেন, এখন ঘুমা, সকালে মজা দেখবি।’
পায়েল উঠে চলে গেলো। বিছানায় শুয়েও পড়লো। কিন্তু ঘুম আসা কি অতো সহজ! মনে মনে রোবট পাখিটার একটা নাম ঠিক করলো। রোবটের রো আর পাখির ইংরেজি বার্ড নিয়ে নাম দিলো রোবার্ড। শুনতে মন্দ নয়।
সকাল ৭টা বেজে ১০ মিনিট। ছাদে একটা চাদর জড়িয়ে বসে আছেন বোতল মামা। তাকে উস্কোখুস্কো চুলের সন্যাসীর মতো দেখাচ্ছে। পায়েলের চোখ ফোলা। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। অবশ্য বোতল মামার সঙ্গে চায়ে চুমুক দিতেই আলসেমী কেটে গেছে।
‘শোন, পাখির সুইচ অন করলেই খেলা শুরু। তারপর আর ফেরানো যাবে না।’
‘মামা! পাখি বলবে না, ওটার নাম রোবার্ড।’
‘বেশ ঠিকাছে, রোবার্ড কিন্তু আমাদের কাছে থাকবে না।’
‘বুঝেছি বুঝেছি! সুইচ টিপলেই ফুরুৎ। কিন্তু অন করবে তো!
‘দাঁড়া আরেকটু চার্জ হোক। রোবার্ডের ভেতর কিন্তু ব্যাটারি নেই। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করেই উড়বে। দুই ঘণ্টার চার্জে চব্বিশ ঘণ্টা উড়বে।’
‘হুঁম, নো প্রবলেম। আজ শুক্রবার। আমার কোনো তাড়া নেই।’
ছাদে একটা শালিক বসেছে। ঘাড় উঁচিয়ে রোবার্ডের দিকে কয়েকবার তাকালেও কাছে আসার সাহস পায়নি। পায়েল ভাবতে লাগলো, পাখিরা আছে মহা আরামে। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। ফুরফুর করে উড়ে বেড়াও। কিন্তু মানুষ যে কেন পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখে তা মাথায় ঢোকে না। পাখি আটকে রাখলে কি গুপ্তধন পাওয়া যায়? অথচ শুধু বাংলাদেশেই লাখ লাখ পাখি এখন খাঁচাবন্দি। পুরো পৃথিবীতে না জানি কতো পাখি বন্দি দিন কাটাচ্ছে!
‘রোবার্ড ইজ রেডি।’ বোতল মামার কথায় সম্বিত ফিরে পায় পায়েল। বোতল মামা দুহাতের তালু ঘষলেন। আলতো করে তুলে নিলেন রোবার্ডকে। পেটের কাছে লাল একটা বোতামে চাপ দিতেই মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ। পায়েল অনেক কষ্টে চোখের পলক আটকে রেখেছে। যদি কিছু মিস্ করে!
রোবার্ডের চোখের ফুটোয় দুটো বাতি জ্বলতে দেখা গেলো। তারমানে রোবার্ড দেখছে! ডানা দুটো তিরতির করে কাঁপতে শুরু করলো!
‘মামা! ছেড়ে দাও! যদি কামড় দেয়!
বোতল মামা ছাড়ার আগেই খটাস্ খটাস্ শব্দ। ঠং ঠং ঠরররং। যান্ত্রিক ডানা দুটো সজোরে উঠছে আর নামছে। সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় দশ মিটার উঠে গেলো রোবট পাখিটা।
‘রোবার্ড উড়ছে! মামা রোবার্ড উড়ছে!
পত্ পত্ নয়, অনেকটা খট্ খট্ শব্দ করে বোতল মামা আর পায়েলের মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে রোবার্ড। বোতল মামা ফিসফিস করে বললেন, এবার পাখি দিয়ে পাখি তোলা হবে।’
মামার কথায় কান নেই পায়েলের। অদ্ভুত দৃষ্টিতে রোবার্ডের কাণ্ড দেখছে।
পায়েলদের দুটো বাসা পরেই অপুদের বাসা। রোবার্ডটা সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে। অপুদের বাড়িটাকে ঘিরে উড়ছে আর প্লাস্টিকের ঘাড়টাকে দ্রুত এদিক সেদিক নাড়াচ্ছে।
হঠাৎ অপুদের বারান্দার রেলিংয়ে বসলো রোবার্ড। পায়েলের চোখ কপালে ওঠার দশা। করছে কি পাখিটা! অপু যদি রোবার্ডকে ধরে ফেলে! কিন্তু না! রোবার্ডকে দেখে মনে হচ্ছে সে যথেষ্ঠ সাবধান। অনেকটা চোরের মতো গ্রিলের ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকলো।
‘মামা রোবার্ড কী করবে!
‘দেখ কী করে। সিস্টেম মতোই কাজ করছে।’
অপু যে খাঁচাটায় পাখি আটকে রাখে সেটার একটা অংশ দেখতে পাচ্ছে পায়েল। রোবার্ডটা সেই খাঁচার উপরেই দাঁড়িয়ে। পায়েলের ভয় লাগছে না। বিশেষ কিছু ঘটার অপেক্ষায় আছে সে।
রোবার্ড তার বিশেষভাবে তৈরি ধারালো ঠোঁট দিয়ে খাঁচার একটা শিক কামড়ে ধরলো। ঘাড় বাঁকাতেই কুটুস করে কেটে গেলো শিক। মনে হলো যেন আলতো করে বাদাম ছিঁড়ছে পাখিটা। একটি, দুটি, তিনটি! পাখি বেরিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট ফাঁক তৈরি হয়েছে। ব্যাস্, রোবার্ডের ইশারা দেখে খাঁচা বন্দি পাখিগুলো এক ঝটকায় বাইরে। একে একে সবাই ফুরুৎ। বেচারা অপু দৌড়ে বারান্দায় এসে আকাশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
এদিকে পায়েলের খুশি দেখে কে! তার চিৎকারে বোতল মামাও খানিকটা বিব্রত। যদি ধরা খেয়ে যান! পায়েল বলেই যাচ্ছে, গো! রোবার্ড গো!
অন্যদিকে খাঁচাবন্দি পাখিগুলো এদিক সেদিক উড়ে গেলেও রোবার্ড ছুটছে আরেকটা বাসা লক্ষ্য করে। তার চোখের ক্যামেরায় আরেকটা খাঁচাবন্দি পাখি ধরা পড়েছে!
এক সপ্তাহ পরের এক বিকেল। বোতল মামা আর পায়েল ছাদে। পায়েলের হাতে একটা পত্রিকা। সে জোরে জোরে একটা খবর পড়ছে। খবরটা অনেকটা এরকম।
‘দেশের বেশকটি জেলায় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। খাঁচা ফুটো করে পোষা পাখি ছেড়ে দিচ্ছে এক রহস্যময় চোর। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চোর নিজেই একটা পাখি। এ নিয়ে পাখি ব্যবসায়ীরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কেননা, এরই মধ্যে দুজন ব্যবসায়ীর প্রায় ত্রিশটি খাঁচা ফুটো করে দুইশ পাখি ছেড়ে দিয়েছে সেই চোর।’
এটুকু পড়েই পায়েল ইয়াহু বলে চিৎকার করে উঠলো। বোতল মামা উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি ভাবছেন অন্য জিনিস। পৃথিবী কেন, বাংলাদেশেরই সবগুলো বন্দি পাখিকে মুক্ত করার ক্ষমতা রোবার্ডের নেই। ঝড়-বৃষ্টিতে ভেতরের একটা যন্ত্র নষ্ট হলেই রোবার্ড অকেজো হয়ে যাবে। তার পক্ষে একগাদা রোবার্ড তৈরিও সম্ভব নয়। আপাতত এ তথ্য গোপন রাখবেন বলে ঠিক করেছেন বোতল মামা। যাই হোক, কয়েকশ পাখিতো মুক্ত হচ্ছে! এটাই বা কম কী! এদিকে পায়েল চিৎকার করেই যাচ্ছে, গো! রোবার্ড গো!

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

| | 0 comments




ধ্রুব নীল

লাল সোয়েটারের সঙ্গে কালো প্যান্ট মাথায় ক্যাপ কোমরে একটা বেল্টও আছে, যদিও ওটা বেশ ঢিলে হয়ে আছে জুতো জোড়াও একদম চকচকে সবমিলিয়ে বেশ গোলমেলে লাগছে পায়েলের বোতল মামার এমন পোশাকের সঙ্গে সে মোটেই পরিচিত নয় তবে দেখতে খারাপও লাগছে না চুলগুলো অবশ্য আগের মতোই আমাজনের গহীন জঙ্গল পাখি ছেড়ে দিলে ওটা নির্ঘাৎ ওড়ার কথা ভুলে যাবে
সোফায় বেশ আমুদে ভঙ্গিতে বসে আছেন বোতল মামা পায়েলের দিকে তাকিয়ে বিজয়ীর মতো হাসছেন
- বিশ্বজয় করে এসেছ মনে হচ্ছে
- বিশ্ব! বল মহাবিশ্ব এখন হাতের মুঠোয় হাহাহা
- ঘটনা খুলে বল আবার কী বানালে?
পায়েল খুব একটা কৌতুহল দেখাচ্ছে না মামা প্রতিবারই কিছু না কিছু বানায় এবং প্রতিবারই সেটা হয় তার সেরা আবিস্কার
- বুঝলি! আমার জীবনের সেরা আবিস্কারটা করে ফেললাম! একেবারে ইউনিক আবিস্কার
- কোথায় সেটা?
- আসবে আসবে একটু পরেই বাসায় ঢুকবে রিকশা ভাড়া দিচ্ছে ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে ঢুকবে
পায়েল হাই তুলল বোতল মামা আবিস্কারের ব্যাপারটা কখনই ঠিকমতো খুলে বলতে পারে না শুরুটা হয় এমন হযবরল
- কী ঢুকবে বললে?
- একটা রোবট বুঝলি একদম ক্লোন কেউ বুঝতে পারবে না আমার এসিসট্যান্ট
একটা রোবট হলো তোমার সেরা আবিস্কার?’ পায়েল কিছুটা অবাক হলোআমি তো ভেবেছিলাম বুঝি ইন্টার-গ্যালাক্টিক টিভি সেন্টার বানিয়েছ
আরে ধুর কী যে বলিস আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানে যে, বাংলায় যাকে বলে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, হ্যাঁ! ওটার একেবারে চুড়ান্ত দেখে ছেড়েছি আবিস্কারটা দেখলে তোর টাশকি লেগে যাবে এখুনি আসবে দাঁড়া
পায়েল সবে ঘাড় ঘুরিয়ে টিভির দিকে চোখ ফেরাতে যাবে, ঠিক তখুনি দরজাটা খুলল কেউ সত্যিকার অর্থে টাশকি লাগা কাকে বলে তা এতোদিন জানা ছিল না পায়েলের এবার তা সত্যিই টের পেল বোতল মামা আসলেই একটা জিনিয়াস আবিস্কারের নমুনা দেখে রীতিমতো গা শিউরে উঠলো পায়েলের
- একি! মামা! দেখি তুমি! এ্যাঁ! তুমিই তো!
দরজা খুলে দুহাতে দুটো ব্যাগ হাতে যিনি ঢুকলেন, তিনি অবিকল বোতল মামার মতো দেখতে পার্থক্যটা শুধু, ব্যাগ হাতে থাকা বোতল মামার গায়ে একটা হাফ হাতার টিশার্ট পরনে জিন্সের প্যান্ট
সোফায় বসে থাকা মামা বললেন, ‘দেখলি তো! এর কথাই বলছিলাম তোকে আমার এসিসট্যান্ট রোবট নাম অ্যালেক্স
দরজা দিয়ে যিনি ঢুকলেন তাকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখাচ্ছে পায়েলের দিকে তাকিয়ে অবিকল সেই বোকা বোকা হাসিটাই দিলেন তিনি তারপর একেবারে বোতল মামার কণ্ঠেই বললেন, ‘কিরে! হা করে দেখছিস কী? অ্যালেক্সকে দেখে ঘাবড়ে গেছিস? হচ্ছে আমার এসিসট্যান্ট রোবট অবশ্য একটু অলস টাইপের কাজকম্ম করতে চায় না
পায়েল নিখুঁতভাবে একটা ঢোক গিলল ঘাবড়ে যাওয়ার বিষয়টি আপাতত গোপন রাখতে চায় গোলমেলে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো কিছুক্ষণ তার আগেই লাল সোয়েটারওয়ালা বোতল মামা তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন তাকেও খানিকটা হতভম্ব দেখাল পায়েলের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন ঠোঁট খানিকটা বেঁকে গেল শুধু বললেন, ‘বুঝলি, একেই বলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একদম মানুষের মতো চিন্তাভাবনা তবে কিন্তু ভাল করেই জানে যে, একটা রোবট আমি চাইলেই তাকে বন্ধ করে দিতে পারিএই বলেই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকালেন প্রথম বোতল মামা
পায়েলের বিষ্ময় ক্রমে বেড়েই চলেছে এদিকে টি-শার্ট গায়ে দেয়া বোতল মামা বিরক্ত মুখে হাতের ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত আড়চোখে একবার সোয়েটারওয়ালা বোতল মামার দিকে তাকালেন একটু হাসলেনও
সোয়েটারওয়ালা বোতল মামার মুখ শুকিয়ে কাঠ পায়েলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওকে বন্ধ করার রিমোট কন্ট্রোলারটা হারিয়ে ফেলেছিরে!’
পায়েল এবার টি-শার্টওয়ালা মামার দিকে তাকালো চোখে একগাদা ভয় আর প্রশ্ন ভীষণ দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেছে
দ্বিতীয় বোতল মামা হাসিমুখে বললেন, ‘রিমোটটা সে খুঁজে পাবে না, কারণ ওটা আমার কাছেএই বলে প্যান্টের ডান পকেটে হাত ঢোকালেন তিনি ঝটপট বাম পকেটেও হাত ঢোকালেন চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপএকি কাণ্ড! আমার কাছেও তো নেই! গেল কোথায়!’ প্রথম বোতল মামার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন টি-শার্ট ওয়ালা বোতল মামানিশ্চয়ই তুমি চুরি করেছ অ্যালেক্স!’
-অ্যালেক্স! আমি অ্যালেক্স? তুমি অ্যালেক্স! আমি মানুষ আমি পায়েলের বোতল মামা!
- না, তুমি নও কারণ তুমি একটা রোবট ইউ আর রোবট! আর বি টি রোবট! বুঝলে!
ধপ করে আবার সোফায় বসে পড়লেন সোয়েটারওয়ালা বোতল মামা পায়েল এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা আসল নকল বোতল মামায় প্যাঁচ লেগে গেছে দারুণ প্যাঁচ! তবে তার আগে ঝগড়া থামানোটা জরুরি তাই পায়েল বলল, ‘কে আসল কে নকল সেটা পরে দেখা যাবে আগে দুজনকেই চা দিই
একথা শুনে দুজনেরই মুখে খুশির ঝিলিক পায়েল হতাশ ভেবেছিল চায়ের কথা শুনে আসল বোতল মামাই লাফিয়ে উঠবে ব্যাপারটা বুঝতে পারলো দুজনই সোয়েটার বোতল মামা বললেন, ‘বুঝেছি, তোর ধারণা চায়ের কথা শুনে শুধু আমিই খুশি হবো, তাই না! আসলে অ্যালেক্সকে আমি এমনভাবে তৈরি করেছি, যেন মানুষের তৈরি সব খাবারই খেতে পারে খাবার থেকে বিদ্যুতও তৈরি করতে পারবে
স্টপ ইট অ্যালেক্স!’ চেঁচিয়ে বললেন টি-শার্ট বোতল মামাপায়েল যা চা নিয়ে আয়, হতচ্ছাড়া রোবটের কথা শুনিস নাপায়েল বোকার মতো দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো বাবা-মা বাসায় নেই শপিংয়ে গেছে ফিরতে সন্ধ্যে হবে তার আগেই নকল বোতল মামাকে চিনতে হবে তা না হলে বিশাল হইচই শুরু হয়ে যাবে
কিচেনে ঢুকে চায়ের পানি বসিয়ে ভাবতে লাগলো পায়েল দুজনের মধ্যে একজন অবশ্যই রোবট কিন্তু কিভাবে প্রমাণ করবে? চিমটি কেটে দেখবে? নাহ, ব্যাথা না পেলেও দেখা যাবে আসল রোবট চেঁচিয়ে উঠছে চা নিয়ে ড্রয়িং রুমে গেল পায়েল দেখলো দুজনই সোফায় বসে মাথা নিচু করে আছে দুজনই ক্লান্ত তবে একজনের ক্লান্তিটা নকল কিন্তু কে সে?
চা রাখতে রাখতে পায়েল নিচু স্বরে বলল, ‘মামা চাদুজনই হাত বাড়িয়ে দুটো কাপ নিলো চিন্তিত মুখে দুজনই চুমুক দিল কাপে পায়েল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে দুজনকে অবিকল একই রকম নাক মুখ টি-শার্টওয়ালা বোতল মামা কাপ রেখেই লাফিয়ে উঠলেনইউরেকা! পেয়েছি!’ পায়েলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শোন, একবার আমরা স্পেসশিপে চড়ে মঙ্গলে গিয়েছিলাম মনে আছে?’ পায়েল উপর-নিচ মাথা নাড়লোহুম, সেখানে আমরা এলিয়েনদের কী করে কাবু করেছিলাম মনে আছে তো?’ পায়েল বলল, ‘হ্যাঁ মনে আছেটি-শার্ট বোতল মামা বিজয়ীর আমুদে কণ্ঠে বললেন, ‘কিন্তু অ্যালেক্স তো সেটা জানে নাসোয়েটার বোতল মামা চোখ কুঁচকে টি-শার্ট বোতল মামার দিকে তাকালেন বললেন, ‘পায়েল, শোন, তোকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে আমার মস্তিষ্কের একটা বড় অংশের কপি করে ওর ভেতর দিয়ে দিয়েছি আমার অনেক স্মৃতিই জানে আর হ্যাঁ, মঙ্গলে আমরা ছড়ায় ছড়ায় এলিয়েনদের কাবু করেছিলাম
প্রচণ্ড হতাশ হলেন টি-শার্ট মামা আবার সোফায় বসে পড়লেন পায়েলের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকালেন ভাবখানা এমন, এবার তুই একটা কিছু কর
পায়েল ভয়ংকর গতিতে ভাবছে বুঝতে পারছে তাড়াতাড়ি আসল বোতল মামাকে বের করতে না পারলে বিপদ বাড়বেআচ্ছা, তোমাদের মধ্যে যে রোবট, তার পেটের ভেতর নিশ্চয়ই নাড়ি-ভুড়ি থাকবে না, থাকবে একগাদা তার আর সার্কিট
একথা শুনে দুজনেরই মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠলো সোয়েটারওয়ালা মামা বললেন, ‘ওরে বাবা! তারমানে তুই এখন আমাদের অপারেশন করে দেখবি! তাহলে বাবা আমিই রোবট!’
উঁহু! পায়েল, কিন্তু তোকে কনফিউজড করে দিচ্ছে তোকে বাধ্য করছে বিশ্বাস করতে যে ওই আসল বোতল মামা
পায়েল আসলেই মহাদ্বিধায় পড়ে গেছে রোবট আর মানুষ পরীক্ষা করতে গিয়ে আবার যদি আসল মামার অপারেশন করে ফেলে তাহলে তো মুশকিল
সোয়েটার বোতল মামা বললেন, ‘আচ্ছা, তুই প্রশ্ন কর আমরা উত্তর দিইএকথা শুনে টি-শার্ট মামা নড়েচড়ে বসলেন আরেকজনের প্রস্তাবে বোধহয় তিনিও রাজি পায়েলও উত্তেজিত চেয়ার টেনে বসে হাল্কা কাশি দিয়ে শুরু করে দিল প্রশ্নোত্তর পর্ব
- একসঙ্গেই উত্তর দেবে কিন্তু হুমম, বলতো দেখি কুসুমপুরে তোমার যে বন্ধু থাকে তার নাম কী?’
দুজনই একসঙ্গে উত্তর দিল, ‘বল্টু
- আচ্ছা দ্বিতীয় প্রশ্ন, বোতল মামার তৈরি প্রথম রোবটটার নাম কী?
- মন্টু!
এবারও দুজন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো সোয়েটারওয়ালা মামা বললেন, ‘পায়েল এভাবে হবে না আমার স্মৃতির কপি করা আছে অ্যালেক্সের ভেতর প্রায় সবই জানেসঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকালো টি-শার্ট মামা তবে কিছু বললেন না
পায়েলের মনের মধ্যে হুট করে কী যেন এসে আবার চলে গেল দুই মামার ঝগড়া তার কানে ঢুকছে না সে ভাবছে বোতল মামার আবিস্কৃত প্রথম রোবট মন্টুর কথা মন্টুর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল হুম... মনে হচ্ছে একটা উপায় খুঁজে পেল পায়েল
- আচ্ছা, তোমাদের মধ্যে একজন তো নিশ্চয়ই আমার আসল মামা
দুজনই চোখ কুঁচকে পায়েলের দিকে তাকালো পায়েল ইচ্ছে করে তার চোখ-মুখ বেশ শক্ত করে রেখেছে কেননা, ভাবসাব দেখে যদি আবার রোবট বোতল মামা তার প্ল্যান বুঝে ফেলে! তাহলে সর্বনাশ আসল মামাকে খোঁজার আর কোনো উপায় থাকবে না
পায়েল দুজনকেই বেশ সূক্ষ¥ভাবে পর্যবেক্ষণ করা শুরু করলো দুই মামাই হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে না জানি কী ভাবছে পায়েল!
আচ্ছা!’ নীরবতা ভাঙলো পায়েলএকটা ধাঁধার সমাধান করে দাও তাহলে
টি-শার্ট মামা বললেন, ‘যে করতে পারবে, তাকেই আসল মামা বলবি? কেমন কথা!’ সোয়েটার মামাও চিন্তিত তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আগে ধাঁধাটা বল শুনি
পায়েল বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, ‘গভীর সমুদ্রে একটি জাহাজ পড়েছে জলদস্যুর খপ্পরে জাহাজের চারদিকেই ঘিরে আছে দস্যু জাহাজের ক্যাপ্টেন ওয়্যারলেসে সাহায্য চাইছেপায়েল একটু দম নিল এদিকে দুজনই টানটান উত্তেজনা নিয়ে শুনছে পায়েল বলল, ‘তো জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল এক অপারেটরের ক্যাপ্টেন বলল, আমরা বিপদে পড়েছি আমাদের দক্ষিণে জলদস্যুর জাহাজ একথা শুনে অপারেটর বলল, ঠিকাছে জাহাজকে পুরোপুরি পূর্বদিকে ঘুরিয়ে নিন ক্যাপ্টেন তার কথামতো জাহাজটিকে পুরোপুরি বাঁ দিকে ঘুরিয়ে নিল কিন্তু সেদিকেও শত্র ক্যাপ্টেন বলল, এখন? অপরপ্রান্ত থেকে জবাব এলো, এবার পুরোপুরি উত্তরে ঘুরিয়ে নিন ক্যাপ্টেন তাই করলো কিন্তু তারপরও শত্র অপারেটরের কথামতো ক্যাপ্টেন জাহাজটিকে এবার পুরোপুরি পশ্চিমে ঘুরিয়ে নিল কিন্তু একি! সেদিকেও জলদস্যু! অপারেটরের কথামতো ক্যাপ্টেন আবার পুরোপুরি বামে অর্থাৎ দক্ষিণে ঘুরিয়ে নিল জাহাজ এরপরও যখন শত্রআসতে থাকলো, তখন ক্যাপ্টেনকে ধমক দিয়ে অপারেটর বলল, কী মশাই! আপনাকে না প্রথমেই বললাম পূর্বদিকে ঘোরাতে! এখনো একদিকেই আছেন দেখছি! এখন তোমরা বল, ক্যাপ্টেন কী করবে?’
হো হো হো করে হেসে উঠলো টি-শার্ট গায়ে দেয়া বোতল মামা হাসির চোটে তিনি কিছু বলতে পারছেন না আর লাল সোয়েটার গায়ে দেয়া মামা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ক্যাপ্টেন এরই মধ্যে তিনশ ষাট ডিগ্রি ঘুরে এসেছেন তার মানে তিনি চাইলেও বাঁচতে পারবেন না একেকবার দিক পাল্টানো মানে নব্বই ডিগ্রি করে ঘোরা হয়েছে
পায়েল তার আসল বোতল মামা পেয়ে গেছে তার মুখে স্বস্তির ছাপ গভীর মনযোগ থাকা সত্ত্বেও যে কিনা কৌতুক শুনে হেসে উঠতে পারে সে আসল মানুষ না হয়ে পারে না যতোই বুদ্ধি থাকুক, কৌতুকের মজা বুঝে হেসে উঠতে রোবটের কিছুটা সময় লাগবেই কারণ পায়েল কোনো ধাঁধা বলেনি সে একটা কৌতুক শুনিয়েছে মাত্র আর তাতেই টি-শার্ট গায়ে দেয়া আসল বোতল মামা হো হো করে হেসে উঠেছে
সোয়েটার গায়ে দেয়া রোবটটা ভালই বেকায়দায় পড়েছে তার দিকে তাকিয়ে এখন পায়েল বোতল মামা মিটিমিটি হাসছে রোবটটাও বুঝতে পারছে না কী হয়েছে পায়েল বলল, ‘তুমি ধরা পড়েছ অ্যালেক্স এখন যদি অস্বীকার কর, তাহলে ধরে বেঁধে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবোলাল সোয়েটার গায়ে বোতল মামারূপী অ্যালেক্স মিন মিন করে বলল, ‘স্যরি স্যার ভুল হয়ে গেছে
এবার আসল বোতল মামা পায়েলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটাই হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স! কখনই অরিজিনাল হতে পারবে না! বুঝলি!’