ধ্রুব নীল
‘স্যার ডাইনে চাপেন, বামে
মুড়ির টিন।’
কথাটা বলেছে রোবট মন্টু।
সে এখন বাসের হেলপারদের ভাষাও রপ্ত করেছে। মুড়ির টিন মানে লোকাল বাস। আর স্যার হলেন
বোতল মামা। তিনি বিশেষ কাজে গতকাল ঢাকায় এসেছেন। সঙ্গে যথারীতি পায়েল। তবে সে কোনো
কাজে আসেনি। মামার সদ্য আবি®কৃত বিশেষ গাড়িতে চড়াই তার আসল উদ্দেশ্য। সঙ্গে খালার বাসায়
বেড়ানোটাও হয়ে যাবে। এক ঢিলে দুই আম।
‘মামা এ জ্যাম কি আজকের
মধ্যে শেষ হবে?’
যাকে প্রশ্নটা করা হয়েছে তিনি আছেন গভীর চিন্তায়। চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবছেন। ‘হুঁম, জ্যাম নয়, একে বলে সিগনাল, বাতি জ্বললে এমনি
এমনিই চলবে।’ ভ্রƒ
কুঁচকে গেল পায়েলের। ‘এমনি
এমনি চলবে মানে! গাড়ি তুমি চালাচ্ছ না?’
বোতল মামা উদাস কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘নারে,
এই ড্রাইভিং জিনিসটা এখনো শেখা হয়নি, গাড়িটা অটোমেটিক চলছে।’
পায়েল মহাবিস্মিত। ‘তাহলে স্টিয়ারিং ধরে রেখেছ কেন?’ বোতল মামা কিছু বললেন না। তিনি আসলে স্টিয়ারিং ধরে
গাড়ি চালানোর অভিনয় করছেন। গাড়ি নিজে নিজে চলছে দেখলে লোকের ভিড় জমে যেতে পারে।
বোতল মামার সদ্য আবি®কৃত
গাড়িটা দেখতে মাঝারি সাইজের জিপের মতো। তবে হুড খোলা নয়। বেশ বড়সড় ছাদ আছে। ওটার কারণেই
মানুষজন বারবার আড়চোখে গাড়িটা দেখছে। অবশ্য ভেতরের কোনো পার্টসই নতুন নয়। জোড়াতালি
দিয়ে তৈরি। দেয়ালজুড়ে একগাদা সার্কিট বোর্ড বসানো। ছাদের দিকটায় বড় সড় একটা ফাঁপা অংশ
আছে। সেখানে একটা কিছু থাকলেও আপাতত তা কেউ দেখছে না।
‘মামা গাড়িটা সব বুঝতে
পারছে কী করে?’
একটু সময় নিয়ে প্রশ্নটা করলো পায়েল। এই কাঠফাটা গরমে একগাদা প্রশ্ন করে মামার মাথা
গরম করে দেবে না বলে ঠিক করেছে।
‘মোশন সেন্সর আছে গোটা
দশেক। নড়াচড়া দেখেই বুঝতে পারবে সামনে কী হচ্ছে, লাল-সবুজ বাতিও দেখতে পাবে।’
‘আমরা যাচ্ছি কোথায়?’ বোতল মামার কোলের উপর একটা ল্যাপটপ কম্পিউটারের
মতো বস্তু, ওটার মধ্যে একটা মানচিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি সেখানে কী যেন খুঁজছেন।
‘আমরা যাবো মিরপুর। দশ
নাম্বার গোলচক্করে আমার এক বন্ধু অপেক্ষা করছে।’ বোতল মামা একটা বোকা টাইপের হাসি দিয়ে
পায়েলের দিকে তাকালেন। ‘বুঝলি,
আমার বন্ধু মানে, জাপান থেকে এসেছে। আমার গবেষণায় অনেক সাহায্য করেছে, ইয়ে মানে, তাকে
একটা জিনিস পৌঁছে দিতে হবে। নতুন একটা যন্ত্রের নকশা। ও সেটা বানিয়ে পরে আমাকে দেবে।’
পায়েল হা করে তাকিয়ে শুনছে।
বোতল মামার বন্ধু! তাও আবার জাপানি বিজ্ঞানী! ‘মামা! তুমি কী এমন বানিয়েছ, যা নিতে জাপান থেকে তোমার
বন্ধু চলে এলো!’
বোতল মামা কিছু বলার আগেই অদ্ভুত জিপ গাড়িটা চলতে শুরু করলো। মামাও তড়িঘড়ি করে স্টিয়ারিংয়ে
হাত রেখে এদিক ওদিক ঘোরাতে লাগলেন। দেখে মনে হচ্ছে তার সমস্ত মনযোগ এখন গাড়ি চালানোর
দিকে। বোতল মামার মাত্রাতিরিক্ত অভিনয়ের কারণেই হোক আর গাড়িটার অদ্ভুত দর্শনের জন্যই
হোক, পল্টন পার হতে না হতেই ট্রাফিক সার্জেন্টের চোখে পড়ে যায় বিশেষ জিপ গাড়িটা।
‘এই সেরেছে!’
‘কী হলো মামা!’
পেছনের সিটে বসে থাকা মন্টু
উঁকি দিয়ে বলল, ‘স্যার,
থামায়েন না, বরাবর টানেন।’ এমনিতেই ঘেমে চুপসে গেছেন বোতল মামা। কোঁকড়া চুলগুলো কপালে
লেপ্টে আছে। নাহ্, মন্টুর কথা শুনতে গেলে বিপদ আরো বাড়বে। বোতল মামা পায়েলের দিকে না
তাকিয়েই ফিসফিস করে বললেন, ‘বুঝলি,
গাড়িতো আর আমি চালাচ্ছি না, তাই ড্রাইভিং লাইসেন্স করা হয়নি। কাগজপত্র কিছু আছে, তাতে
লাভ হবে না। ভেতরে এতো যন্ত্রপাতি দেখলে জঙ্গি সন্দেহে সোজা জেলে।’ পায়েলের পিঠের দিকে
শিরশির করে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। এখন উপায়!
‘দেখি কাগজ দেখি।’
বোতল মামা লাজুক টাইপের
হাসি দিলেন। চৈত্র্যের আগুন গরমে এমন হাসি দেয়া মামার মোটেও উচিৎ হয়নি। সন্দেহের চাপে
সার্জেন্টের ভ্রƒ
আরেকটু উপরে উঠে গেল। বোতল মামা প্যান্টের পকেটে কী যেন হাতড়াতে লাগলেন। কিন্তু সেই
পুরনো সমস্যা। শার্ট আর প্যান্টে এতোগুলো পকেট, কোথায় কি থাকে মনে রাখাই মুশকিল। বোতল
মামা একে একে পকেট হাতড়াচ্ছেন আর সার্জেন্টের চেহারায় বিরক্তির ছাপ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
‘দেখি বুঝছি, নামুন।’
যাক সময়মতো জিনিসটা পেয়ে
গেলেন মামা। ছোট একটা আইডি কার্ড। বিশেষ মুহূর্তে এটা বেশ কাজে আসে। তবে এখন নাও আসতে
পারে। জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে কার্ডটা সার্জেন্টের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।
‘উঁহু, এটা নয়, লাইসেন্স
দেখতে চেয়েছি।’
‘জ্বি এটা... এটা আন্তর্জাতিক
বিজ্ঞান সংস্থার পরিচয় পত্র। আমি একজন বিজ্ঞানী।’
সার্জেন্ট হাত দিয়ে কপালের
ঘাম মুছলেন। পায়েল বুঝতে পারলো অবস্থা বেগতিক।
‘আগে নামেন, তারপর আইনস্টাইন
নিউটন সব বের হবে।’
পায়েল কিছুটা অপমাণ বোধ
করলেও বোতল মামা চোখ কুঁচকে কী যেন ভাবছেন। এখন মনে হচ্ছে মন্টুর কথাই শোনা উচিৎ ছিল।
সার্জেন্টের হাত থেকে আইডি
কার্ডটা নিয়ে পকেটে ঢোকালেন বোতল মামা। ভাব দেখে মনে হবে তিনি বুঝি নামার প্রস্তুতি
নিচ্ছেন। আসলে ভাবছেন অন্য কিছু। গাড়ির নাম্বার প্লেটটা পুরনো এবং যথারীতি তা আসল নয়।
পালিয়ে গেলে খুব একটা অপরাধ হবে না। তার এ বিশেষ গাড়ির জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স তো না
থাকলেও চলে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট ওয়্যারলেসে
কী যেন নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। তার খুব একটা তাড়া আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে মামাকেও
খুব একটা চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছে না। আপাতত পালাবেন বলে ঠিক করেছেন। তবে সমস্যা একটা
রয়েই গেছে। গাড়িকে নির্দেশ দিয়েও লাভ নেই। সামনে কিছু থাকলে গাড়িটা শত নির্দেশেও চলবে
না। আর তাদের জিপটার ঠিক সামনেই রাখা আছে সার্জেন্টের মোটর সাইকেল। অগত্যা দ্বিতীয়
পথে না গেলে আর হচ্ছে না। বোতল মামা দ্রুত ইশারায় পায়েলকে বুঝিয়ে দিলেন, ‘শক্ত করে ধরে বস।’ উত্তেজনায় পায়েল ঘাড় নাড়াতেও ভুলে
গেছে। সিটের হাতল আঁকড়ে ধরতেই বোতল মামা সামনের একটা সুইচে টিপে দিলেন। সার্জেন্টের
অবাক দৃষ্টি উপেক্ষা করে দুই জন মানুষ ও একটা রোবট শুদ্ধ আস্ত জিপখানা শূন্যে উঠতে
শুরু করলো। গাড়ির নিচে তীব্র বেগে একটা কিছু বেরুচ্ছে। পায়েলের বুঝতে দেরি হয়নি গাড়িটার
নিচে রকেটের মতো জেট ইঞ্জিন আছে। ট্রাফিক সার্জেন্ট হতভম্ব হয়ে নিউটনের তৃতীয় সূত্র
চাক্ষুষ করছেন। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে বিশাল জটলা পাকিয়ে গেল। সিনেমা ছাড়া এমন দৃশ্য
কেউ এর আগে দেখেনি।
এদিকে গাড়িটা বিশ ফুটের
মতো উঠে থেমে গেছে। আর উঠতে পারছে না। কিন্তু সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুইচ কোনটা
তা মনে পড়ছে না মহাবিজ্ঞানী বোতল মামার। তাকে বেশ অসহায় দেখাচ্ছে। নিচে ততোক্ষণে মহা
হই চই। পুলিশের বাঁশিতে কান পাতা দায়। পায়েল হাতল ছেড়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। ক্লিক
ক্লিক শব্দ আর আলোর ঝলকানি দেখতে পাচ্ছে। তার মানে পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় বোতল
মামা! একটু আগে ভয়ে আধখানা হলেও এখন পায়েল খুশিতে আটখানা। রাস্তায় বিশাল জ্যাম লেগে
গেছে। তা নিয়ে পায়েলের চিন্তা নেই। তারা এখন সকল জ্যামের উর্ধ্বে। সিগনালেও কিছু যায়
আসে না।
‘কিন্তু মামা গাড়িটা সামনে
এগুচ্ছে না কেন?’
বোতল মামা জবাব না দিয়ে একের পর এক সুইচ টিপতে লাগলেন। একটু পর গাড়ির ছাদ ফুটো হয়ে
পতপত করে একটা প্যারাসুট খুলে গেলো। ওটার জন্যই ছাদটাকে ফাঁপা মনে হচ্ছিল। নাহ্ ভুল
হচ্ছে! আপনমনে বিড়বিড় করছেন বোতল মামা। নিচের হই চইয়ে তার নজর নেই।
শেষপর্যন্ত আসল সুইচটা
পেয়ে গেলেন। কিন্তু শুধু এটা টিপলেই গাড়ি চলবে না। দিক পাল্টানোর জন্য বোতল মামাকে
স্টিয়ারিং ঘোরাতে হবে, আর এক্সিলারেটরটাও চেপে ধরতে হবে। শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স ছাড়াই
ড্রাইভিং করতে হচ্ছে। অবশ্য গাড়িটা মাটিতে নেই বলেই রক্ষে। বোতল মামার মুখে তাই বিজয়ীর
হাসি। জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে সেই ট্রাফিক সার্জেন্টের দিকে তাকালেন। সার্জেন্টও মামার
দিকে তাকিয়ে আছেন। তবে তার ভ্রƒ
কুঁচকে নেই। তিনিও অন্য সবার মতো হাত নেড়ে বাহবা দিচ্ছেন। ভাবখানা এমন যেন এমন আবিষ্কারে
তিনি মহাগর্বিত।
নিচ থেকে পায়েলকে উদ্দেশ্য
করে কে যেন চিৎকার করে উঠলো, ‘খুকী,
তোমরা যাবে কোথায়?’
পায়েল উত্তর দেয়ার আগেই পেছনের জানালা দিয়ে মন্টু মাথা বের করে গাড়ির দেয়াল চাপড়ে বলতে
লাগলো, ‘আসেন আসেন সিট খালি
সিট খালি শাহবাগ, ফারমগেট...।’


